বাংলাদেশের অভিনয়জগতের অন্যতম গুণী ও বরেণ্য শিল্পী ডলি জহুর। দীর্ঘ কয়েক দশকের অভিনয়জীবনে অসংখ্য চলচ্চিত্র ও নাটকে অভিনয় করলেও দুটি চরিত্র তাকে এনে দিয়েছে অমর জনপ্রিয়তা। শঙ্খনীল কারাগার চলচ্চিত্রে ‘রাবেয়া’ এবং হুমায়ূন আহমেদের কালজয়ী ধারাবাহিক এইসব দিনরাত্রি–তে ‘নীলু ভাবি’ চরিত্র আজও দর্শকের হৃদয়ে সমানভাবে বেঁচে আছে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ডলি জহুর বলেন, এইসব দিনরাত্রি প্রচারের সময় বাংলাদেশে মাত্র একটি টেলিভিশন চ্যানেল ছিল। নাটকটির গল্প ও চরিত্রগুলো অল্প সময়েই মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
তিনি বলেন, “আমার চরিত্রের নাম ছিল নীলু। কিন্তু মানুষ আমাকে ‘নীলু ভাবি’ বলেই চিনতে শুরু করেছিল। কোথাও গেলে অনেকে বলতেন, ‘দেখো, নীলু ভাবি যাচ্ছেন।’ একজন শিল্পীর জীবনে এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে! এই একটি চরিত্র আমাকে মানুষের অসীম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা এনে দিয়েছে।”
ডলি জহুর জানান, নাটকটি প্রচারের সময় তার নামে শত শত চিঠি আসত। ধানমন্ডির বাসার ঠিকানার পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) ঠিকানাতেও নিয়মিত চিঠি পৌঁছাত। অনেক খামের ওপর শুধু লেখা থাকত—‘ডলি জহুর, অভিনেত্রী, বাংলাদেশ’। তবুও ডাক বিভাগের কর্মীরা সেগুলো সঠিক ঠিকানায় পৌঁছে দিতেন।
তিনি বলেন, “চিঠিগুলো আমি খুব যত্ন করে পড়তাম। বেশিরভাগ মানুষ লিখতেন—‘নীলু ভাবির মতো একজন পুত্রবধূ চাই’, ‘নীলু ভাবির মতো একজন ভাবি চাই’ কিংবা ‘আমাদের বাড়িতে নীলুর মতো একটি মেয়ে আসুক।’ এসব চিঠি পড়ে মনে হতো, মানুষ একটি নাটকের চরিত্রকেও কতটা আপন করে নিতে পারে।”
অনেক চিঠির মধ্যে একটি বিশেষ চিঠির কথা এখনও ভুলতে পারেননি এই বরেণ্য অভিনেত্রী। তিনি বলেন, “একজন বয়স্ক ব্যক্তি লিখেছিলেন, জীবনের শেষ সময়ে এসে তার সবচেয়ে বড় আফসোস—নীলুর মতো একজন বৌমা তিনি পাননি। চিঠিটি পড়ে আমি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম।”
ডলি জহুরের ভাষায়, সেই সময়ের দর্শকদের ভালোবাসা ছিল নিখাদ ও আন্তরিক। তিনি বলেন, “একটি চরিত্রের জন্য মানুষ আমাকে এত ভালোবেসেছে, মনে রেখেছে, আশীর্বাদ করেছে—এটাই আমার অভিনয়জীবনের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।”
স্মৃতির ঝাঁপি খুলে তিনি আরও একটি মজার ঘটনার কথা জানান। একদিন দুই তরুণ তার বাসায় এসে জানতে চেয়েছিলেন, তার কোনো ছোট বোন আছে কি না। কারণ, থাকলে তারা তাদের বড় ভাইয়ের সঙ্গে তার বিয়ে দিতে চান। বিষয়টি স্মরণ করে হেসে তিনি বলেন, “আমি বলেছিলাম, আমার বোন থাকলেই যে সে নাটকের নীলুর মতো হবে, তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই!”
বর্তমান সময় সম্পর্কে জানতে চাইলে ডলি জহুর বলেন, বয়সের কারণে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয় এবং ওষুধ খেতে হয়। তবে তিনি সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ যে এখনও সুস্থ আছেন।
অভিনয়ের প্রসঙ্গে তিনি জানান, এখনো কাজ করছেন, তবে আগের তুলনায় অনেক কম। ভালো গল্প ও উপযুক্ত চরিত্র পেলে মাঝে মধ্যেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান।
অভিনয়জগতের নতুন প্রজন্মের অনেক শিল্পী তাকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেন। বিষয়টি নিয়ে আবেগাপ্লুত ডলি জহুর বলেন, “অনেকেই আমাকে মা বলে ডাকে। ওদের এই ভালোবাসা আমাকে ভীষণ আনন্দ দেয়। আমিও ওদের নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ করি।”
দীর্ঘ অভিনয়জীবনের অসংখ্য অর্জনের মধ্যেও ‘নীলু ভাবি’ চরিত্রের প্রতি দর্শকদের অকৃত্রিম ভালোবাসাই ডলি জহুরের কাছে সবচেয়ে বড় সম্মান ও প্রাপ্তি। সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছু বদলে গেলেও, বাংলা নাটকের ইতিহাসে ‘নীলু ভাবি’ আজও দর্শকের হৃদয়ে এক অনন্য আবেগের নাম।